রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে আমেরিকার কাছ থেকে কোনও আগাম সতর্কবার্তা পায়নি ইউক্রেন। এমনই অভিযোগ করলেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। কিয়েভের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে হামলার ঘটনাকে ঘিরে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ফের সরব হলেন তিনি। মস্কোর প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নরম মনোভাব নিয়ে দুই নেতার বিরোধের মধ্যেই আমেরিকার বিরুদ্ধে ‘বাস্তবতা অস্বীকারের’ অভিযোগ তুলেছেন জেলেনস্কি।

অ্যান্ড্রু রথ, কিয়েভ | ১৯ অক্টোবর ২০২৬
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

সোমবার ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহনাত টেলিভিশনে জানান, রবিবার রাত প্রায় ১১টায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক কিয়েভের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে আঘাত হানার আগে কোনও সতর্কবার্তা পায়নি ইউক্রেন। এর আগে ইউক্রেন সরকারের এক আধিকারিকও ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে জানিয়েছিলেন, আসন্ন হামলা সম্পর্কে রাজধানীকে সতর্ক করেনি আমেরিকা। তবে রাত ৩টের দিকে হওয়া পরবর্তী হামলার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিল ইউক্রেন।

সোমবার সকালে সমাজমাধ্যমে জেলেনস্কি লেখেন, “আবারও সারা রাত ধরে একাধিক দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। আর আবারও আমাদের সহযোগীদের কাছ থেকে কোনও সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি।”

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও অভিযোগ করেন, আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ আটকে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়া নিষেধাজ্ঞায় ছাড় পাচ্ছে কিংবা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই পদক্ষেপগুলি ইউক্রেনের সহযোগীদের ‘বাস্তবতা অস্বীকারের’ পরিচয়।

নিষেধাজ্ঞায় ছাড়, ট্রাম্পের যুক্তি

শুক্রবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার একটি প্যাকেজের প্রয়োগ স্থগিত করেন ট্রাম্প। প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামাঙ্কিত ওই আইনটি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই পাশ হয়েছিল। কংগ্রেসকে ট্রাম্প জানান, জাতীয় স্বার্থেই আইনটির প্রয়োগে বিরতি দেওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে, আমেরিকার কাছ থেকে পিএসি-৩ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের গতি কমে যাওয়ার অভিযোগও করেছে ইউক্রেন।

রবিবার নিজের সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লেখেন, “রাশিয়া সম্পর্কে আমার সিদ্ধান্ত খুবই সহজ। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমি আলোচনা চালাচ্ছি। এমন কিছু করতে চাই না, যা বোকামি করে রাশিয়াকে আলোচনার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।”

জেলেনস্কিকে আক্রমণ করে ট্রাম্প আরও লেখেন, “জেলেনস্কির তাতে কিছু যায় আসে না। আর সত্যি বলতে, ইউরোপ যে তাঁকে বিপুল টাকা দিচ্ছে, তা তো সকলেরই জানা… তিনি এই যুদ্ধ শেষ করতে চান না। সম্ভবত কখনওই চাননি।”

সফটওয়্যারের ত্রুটি, না অন্য কারণ?

বছরের পর বছর ধরে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ইউক্রেনকে সতর্ক করে এসেছে আমেরিকা। সেই আগাম বার্তার ফলে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ বিপদসংকেত বাজানোর জন্য কয়েক মিনিট সময় পেত। সাধারণ মানুষও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার আগে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছনোর সুযোগ পেতেন।

কিন্তু জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের প্রকাশ্য বিরোধের মধ্যেই ইউক্রেন জানিয়েছে, গত সপ্তাহে অন্তত তিন দিন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে কোনও সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি।

উজবেকিস্তানের সমরখন্দ সফরে গিয়ে সোমবার ভোরে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও বলেন, “গত রাতে যদি এমন হয়ে থাকে, তা হলে ঠিক কী হয়েছে আমি জানি না। আমি জানি, কয়েক রাত আগে ওদের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় সফটওয়্যার-সংক্রান্ত একটি সমস্যা হয়েছিল।”

আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় সফটওয়্যারের ত্রুটির কথা এর আগে মার্কিন আধিকারিকেরা প্রকাশ্যে জানাননি। অন্তত একটি ঘটনায় ইউক্রেনের আধিকারিকদের বলা হয়েছিল, দক্ষিণ রাশিয়ার খারাপ আবহাওয়ার কারণে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি শনাক্ত করা যায়নি। রুবিও জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইউরোপীয় কমান্ড ঘটনাগুলি খতিয়ে দেখছে।

সহায়তা নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

ইউক্রেনের অভিযোগ, দেশটিকে সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি একাধিক পরিষেবা ও কর্মসূচি হঠাৎ ব্যাহত হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতির দায় নিতে নারাজ ওয়াশিংটন। ইউক্রেনে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা ইচ্ছাকৃত ভাবে সীমিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইলন মাস্কের পরিচালিত এই উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা ইউক্রেনের আক্রমণকারী ড্রোন এবং বিমানবিধ্বংসী অস্ত্রব্যবস্থা—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এ ছাড়াও ‘পার্ল’ বা পিইউআরএল প্রকল্পের আওতায় আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র সরবরাহেও দেরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে কিয়েভ। এই ব্যবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলি আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কিনে ইউক্রেনকে সরবরাহ করে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিতে হামলা বন্ধ না করলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহের গতি কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

রুশ হামলার আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়া, আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মার্কিন সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে কিয়েভের উদ্বেগ বাড়ছে। জেলেনস্কির অভিযোগ, শান্তি আলোচনার কথা বললেও আমেরিকার একাধিক পদক্ষেপ ইউক্রেনের নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।